DBC News
ওয়াজ মাহফিলে শিশু বক্তাদের ব্যবহার করে উস্কানিমূলক বক্তব্য

ওয়াজ মাহফিলে শিশু বক্তাদের ব্যবহার করে উস্কানিমূলক বক্তব্য

ওয়াজ মাহফিলে শিশু বক্তাদের ব্যবহার করে বিদ্বেষমূলক ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে সাধারণত ইসলামি শরীয়তের ব্যাখ্যা সম্বলিত নানা উপদেশ দিয়ে থাকেন বিশেষজ্ঞ ইসলামি চিন্তাবিদগণ। তবে, সাধারণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে শিশুদের ব্যবহার করতে মাঠে নামে কিছু লোক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় শিশুদের এসব ওয়াজ স্থানীয়ভাবে ধারণ করা হয়। পরে তা ছড়িয়ে দেয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ও ইউটিউবে। এসব শিশুদের অনেকেই ধর্মীয় ব্যক্তিদের সমালোচনাকারীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে মাঠে নামার মতো উস্কানি দিচ্ছে।

খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবিদের কটাক্ষ করা, নারীর এগিয়ে যাওয়ার বিরোধীতা, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা এমনকি হত্যারও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এসব কথিত ওয়াজ মাহফিল থেকে। এসব শিশু বক্তাদের নিয়ে নানা শঙ্কার কথা জানান ইসলামি চিন্তাবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।

ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, 'ওয়াজ শব্দের অর্থই হল উপদেশ, এটা বিনোদন নয়। বর্তমানে, শুধুমাত্র শিশু বক্তাদের নিয়ে ওয়াজ করানো হচ্ছে তাই নয়। ওয়াজের সময় বিনোদনমূলক কথাবার্তা হাসি-ঠাট্টা বা অশ্লীল কথাবার্তাও বক্তাদের বলতে শোনা যাচ্ছে।' ওয়াজ মাহফিলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এসব বিষয়েই আলচনা করার কথা বলেও জানান ফরিদ উদ্দীন মাসউদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদ বলেন, 'শিশু বক্তাদের এনে মানুষ জড়ো করাই এসব ওয়াজ মাহফিলের মূল লক্ষ্য।‘ তবে, ওয়াজ মাহফিলে শিশু বক্তাদের ব্যবহার করার ফলে ধর্মীয় যে ভাবগাম্ভীর্য ও গুরুগাম্ভীর্যতা রয়েছে তা ব্যাহত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন ড. আব্দুর রশীদ।

এ বিষয়ে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এরকম বিশ্বাস এবং আবেগ নিয়ে শিশুরা যদি বড় হতে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে তাদের উগ্রবাদ বা বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'

শিশুদের এসব কাজে ব্যবহার করাকে অনৈতিক উল্লেখ করে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, ‘শিশুদের ব্যবহার করে একধরনের কথা শেখানো হচ্ছে বা বলানো হচ্ছে, এটা কিন্তু শিশু অধিকার এবং নৈতিকতার পরিপন্থী একটি কাজ।  

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, যারা এরকম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানোর কাজে জড়িত তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সেটা ধর্মীয়, জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ যাই হোক না কেন তা থেকে যেন বিরত থাকে।'

এসব ওয়াজ মাহফিলে জিহাদ করে হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার পাশাপাশি টানা হচ্ছে নানান উদাহরণ। এক শিশু বক্তাকে তার বক্তব্যে বলতে শোনা যায়, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হলে জিহাদ করে নির্যাতনকারীদের মেরে ফেলার ডাক দেয়া হচ্ছে। আবার ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে-এসব পড়া, পড়তে নবী নিষেধ করেছে’ এমন অসংলগ্ন বক্তব্য দিতেও দেখা যায়।

তবে, ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ বলেন, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা শিশুদের ইসলামের কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার কোনো অধিকার নেই।‘ এছাড়া তাদের দিয়ে এমন দায়িত্বপূর্ণ কোনো কাজ করানো উচিত নয় বলেও জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদ বলেন, ‘শিশুদের ওপর যেখানে নামাজ, রোজা বা হজ যাকাত ফরজ না সেখানে তাদের এসব বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।‘

কবি শামসুর রহমান, হুমায়ন আজাদসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন ব্যাক্তিদের শিক্ষা নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে এসব শিশুরা। তবে, এসব শিশু বক্তাদের এক জায়গায় বেশ মিল পাওয়া যায়, তা হলো নারী বিদ্বেষ।

এ বিষয়ে নারী অধিকার কর্মী সুলতান কামাল বলেন, এটা যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে সরকারকে সাংবিধানিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বড়দের পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের। এসব শিশুরা ধাবিত হতে পারে উগ্রবাদের দিকে। তাই সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিশুদের জন্য সাম্প্রদায়িকতামুক্ত পৃথিবী গড়ার দাবি সকলের।